বিরাজমান ধরনের রাজনীতি দিয়ে দেশের কোনো উপকার হচ্ছে না—এই বাস্তবতার জবাব প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত। এই রাজনীতির দ্বারা দেশের কোনো কল্যাণ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। বরং দুর্দশাই বাড়ছে। এটি মূলত পুরনো ও অতীতের ধারাবাহিকতায় চলমান এক ধরনের রাজনীতি।
বারবার রাষ্ট্রক্ষমতা বদলালেও রাজনীতির চরিত্র বদলায়নি। যারা ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে, তারা দেশের স্বার্থ নয়, নিজেদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়। দেশের যে সামান্য সম্পদ রয়েছে, তা দ্রুত নিজেদের করতলগত করার চেষ্টা চলে। এমনকি প্রয়োজনে বিদেশিদের হাতে তুলে দিতেও তারা দ্বিধা করে না।
জনগণের মুক্তির প্রশ্নটি আসলে সম্পদের মালিকানার প্রশ্ন। দেশ দরিদ্র—এ ধারণা ভ্রান্ত। প্রকৃত সমস্যা হলো দেশের সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা না থাকা এবং সেই সম্পদের বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া। দেশের খরচে মানুষকে শিক্ষিত করা হলেও সেই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন থাকে বিদেশে চলে যাওয়া বা দেশে থেকেই বিদেশি কোম্পানিতে কাজ করার। ফলে দেশের অর্থে অর্জিত দক্ষতা দেশের কাজে না লেগে বিদেশি স্বার্থেই ব্যবহৃত হয়।
এর চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো দেশের বন্দর, ভূমি ও খনিজ সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। পরাধীনতার মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল সম্পদের ওপর বিদেশি কর্তৃত্ব। সাম্রাজ্যবাদীরা এ দেশে দালাল, কর্মচারী ও সহযোগী শ্রেণি তৈরি করেছিল এই সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য। পাঠান-মোগলদের সময় থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসনামলে এই লুণ্ঠন চূড়ান্ত রূপ নেয়। ইংরেজরা সম্পদ নিয়ে গেছে নিজেদের দেশে, আর এ দেশ পরিণত হয়েছে নিঃস্ব এক জনপদে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল কারণও ছিল এই সম্পদের মালিকানা। পূর্ববঙ্গের সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাতে। বাঙালিরা দাবি করেছিল—এ দেশের সম্পদ এ দেশের মানুষেরই থাকবে। সেই দৃঢ়তার কারণেই দখলদার বাহিনী গণহত্যায় নেমে পড়ে।
যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা এলেও দেশের সম্পদের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সামাজিক সম্পদ ক্রমেই ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাচ্ছে। কলকারখানা ব্যক্তিগত হচ্ছে, আর সবচেয়ে ভয়াবহভাবে জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শাসকগোষ্ঠী এই প্রক্রিয়া ঠেকানোর বদলে উল্টো সহযোগিতা করছে—নিজেদের স্বার্থে।
অবৈধ পথে ক্ষমতায় আসা শাসকেরা রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই বলে দাবি করলেও, বাস্তবে তারা প্রথম দিন থেকেই নতুন রাজনীতির সূচনা করে। দল গঠন, উপদেষ্টা নিয়োগ, তথাকথিত সংস্কারের নামে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলে। সাধারণ মানুষ এসব রাজনীতিকে ‘পলিটিকস’ নামে চেনে—যা রাষ্ট্র থেকে পরিবার পর্যন্ত সর্বত্র বিদ্যমান।
ইতিহাস এ ধরনের কাজ আগে ক্ষমা করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। তবে প্রশ্ন হলো—এই ভবিষ্যৎ কি আমরা পাব, যদি এখনই প্রতিরোধ গড়ে না তুলি? একাত্তরের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, প্রতিরোধ ছাড়া মুক্তি আসে না। মুক্তির অর্থ কেবল কিছু ব্যক্তির নিরাপত্তা নয়, বরং সমগ্র জনগোষ্ঠীর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা।
এই লক্ষ্য অর্জনে নীতি, আদর্শ ও স্বপ্ননির্ভর বড় রাজনৈতিক শক্তির অভাব স্পষ্ট। তবু জনগণকে বাঁচতেই হবে। তাই মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষায় যে রাজনৈতিক শক্তি কাজ করবে, তাকে বিকশিত করাই দেশপ্রেমিক মানুষের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব ভুলে গেলে ক্ষতিটা হবে অপূরণীয়।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।











