দেশের বাজারে ভেজাল খাদ্যের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গা শহরতলির বঙ্গজপাড়ায় ‘মৌসুমি ফুড’-এর কারখানায় অভিযান চালিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ডালডার ভেতরে মরা ইঁদুর ভাসতে দেখেছে। ওই ডালডা দিয়েই বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এ ছাড়া শহরের রেলবাজার এলাকার ‘অনন্যা ফুড’ থেকে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য জব্দ করা হয়, যা বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছিল। এ অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বিশেষ করে রমজানকে সামনে রেখে ইফতারের বিভিন্ন খাবার ও শরবতে ফুড গ্রেডের নামে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর রং ব্যবহার করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত পোড়া তেলে ভাজা হচ্ছে বেগুনি, পিঁয়াজু ও অন্যান্য ভাজাপোড়া খাবার। এসব রাসায়নিক উপাদান শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করছে এবং কিডনি, লিভার, ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও চর্মরোগসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া জানান, নিয়মিত মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক শনাক্ত করা হচ্ছে। সম্প্রতি কেওড়া জল ও গোলাপজলে অননুমোদিত রাসায়নিক পাওয়া গেছে এবং এসব পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতি জেলায় মাত্র একজন কর্মকর্তা থাকায় কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ সমস্যার সমাধানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় নতুন ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল বা দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয় এবং মারা যায় প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে প্রতি বছর ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে, ২ লাখ কিডনি রোগে এবং দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল খাদ্যে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রং, প্রিজারভেটিভ, ফরমালিন ও অতিরিক্ত তেল দীর্ঘমেয়াদে শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এতে লিভার, কিডনি ও হৃদযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও বেশি।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও ভেজাল বন্ধ করা যাচ্ছে না।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যে ভেজাল বন্ধে কঠোর নজরদারি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।











