ইন্টারনেটের দুনিয়ায় তথ্যের কোনো অভাব নেই। বরং সমস্যাটা উল্টো—তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়। এই বিপুল তথ্যসমুদ্রে যেমন মূল্যবান জ্ঞান আছে, তেমনি রয়েছে বিভ্রান্তিকর খবর, গুজব, অপ্রাসঙ্গিক কনটেন্ট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা। বর্তমানের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীর মনোযোগ যতক্ষণ সম্ভব স্ক্রিনে আটকে রাখা যায়। ফলে আমরা না চাইতেও অগণিত তথ্যের স্রোতে ভেসে যাই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে শুধু ‘সমালোচনামূলক চিন্তা’ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ‘সমালোচনামূলক উপেক্ষা’—অর্থাৎ সচেতনভাবে কিছু তথ্য এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা।
কেন শুধু সমালোচনামূলক চিন্তা যথেষ্ট নয়?
ছোটবেলা থেকে আমাদের শেখানো হয়, কোনো তথ্য পেলে তা মনোযোগ দিয়ে পড়তে এবং বিচার-বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করতে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে তথ্যের পরিমাণ এত বিপুল যে, প্রতিটি খবর, পোস্ট বা লিংক যাচাই করতে গেলে সময়ই শেষ হয়ে যাবে। তথ্যের এই বন্যায় প্রতিটি কনটেন্টকে গুরুত্ব দেওয়া মানে নিজের মানসিক শক্তি ও সময় অপচয় করা।
তার ওপর বিভ্রান্তিকর বা উত্তেজনামূলক কনটেন্টের মূল উদ্দেশ্যই হলো মনোযোগ কাড়ানো। আপনি যখন সেগুলোতে ক্লিক করেন, মন্তব্য করেন বা শেয়ার করেন, তখন অজান্তেই সেই কনটেন্টকে আরও ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেন। ফলে শুধু সমালোচনামূলক চিন্তা নয়, বরং কোন কনটেন্ট উপেক্ষা করা উচিত—সেটি জানা আরও জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাধানের ৩টি কৌশল: কী এড়িয়ে চলবেন এবং কীভাবে?
১. ডিজিটাল পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ
আপনার ফোন বা কম্পিউটারের সেটিংস এমনভাবে সাজান, যাতে তা আপনার কাজে সহায়ক হয়, বিভ্রান্তিকর নয়। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের অনুমতি সীমিত করুন। বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার কমিয়ে আনলে অপ্রাসঙ্গিক কনটেন্টের আক্রমণও কমবে। নিজের ডিজিটাল পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হবে।
২. ল্যাটেরাল রিডিং বা ‘পাশাপাশি পড়া’
কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকে সরাসরি তথ্য বিশ্বাস না করে আগে অন্য একটি ট্যাবে গিয়ে সেই সাইট বা লেখকের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করুন। পেশাদার ফ্যাক্ট-চেকাররা এভাবেই কাজ করেন। সাইটটি যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, আগে দেখুন অন্য নির্ভরযোগ্য সূত্র সেই তথ্য সম্পর্কে কী বলছে। এই অভ্যাস আপনাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে দূরে রাখবে।
৩. ট্রোল ও গুজব ছড়ানোদের উপেক্ষা
অনলাইনে অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ক উসকে দিয়ে মনোযোগ কাড়তে চায়। তাদের সঙ্গে তর্কে জড়ানো মানেই তাদের উদ্দেশ্য সফল করা। এমন কনটেন্ট দেখলে সরাসরি এড়িয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে ব্লক বা রিপোর্ট করা—এটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
দার্শনিক উইলিয়াম জেমস বলেছিলেন, “জ্ঞানী হওয়ার শিল্প হলো কী কী উপেক্ষা করতে হবে তা জানার শিল্প।” ডিজিটাল যুগে এই কথার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আজ আপনি কত তথ্য জানলেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—কত অপ্রয়োজনীয় তথ্য এড়িয়ে নিজের সময়, মনোযোগ ও মানসিক শান্তি রক্ষা করতে পারলেন।
তথ্যের সাগরে ডুবে যাওয়ার আগে প্রয়োজন সচেতন নৌকা—যার নাম ‘সমালোচনামূলক উপেক্ষা’। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই এই দক্ষতা শেখানো গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথ্যের ভিড়ে পথ হারাবে না; বরং বেছে নেবে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, এড়িয়ে যাবে অপ্রয়োজনীয় শব্দ।











