আড়িয়াল খাঁ নদে তখন ভাটার টান। বরিশালের মুলাদী উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদটির বুকে সারি সারি নৌকা গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন জলের ওপর ভেসে থাকা একটি পাড়া।
শান্ত সেই দৃশ্য কাছে গেলে ভেঙে পড়ে। কানে আসে শিশুর কাশি, কান্না, কোথাও হাঁকডাক। কাঠের নৌকাগুলোই মান্তা সম্প্রদায়ের ঘর—এখানেই জন্ম, এখানেই বড় হওয়া, এখানেই শেষ জীবন।
এক মান্তা মা বলছিলেন, সন্তান যেন পানিতে পড়ে না যায়, সে জন্য কোমরে রশি বেঁধে রাখতে হয়। কথা বলতে বলতে তাঁর দৃষ্টি বারবার চলে যায় নদীর দিকে। সামান্য অসাবধানতায় সন্তান হারানোর ভয় তাদের নিত্যসঙ্গী। সারাদিন নৌকায় বন্দি এই জীবনে নিরাপত্তা বলতে কার্যত কিছুই নেই—না রাষ্ট্রের, না সমাজের।
ভোট এলেই আশ্বাস আসে—ঘর দেওয়া হবে, জায়গা দেওয়া হবে, ভোটার আইডি হলে নাগরিক সুবিধা মিলবে। কিন্তু ভোট শেষ হলেই সেই আশ্বাস মিলিয়ে যায়। মান্তাদের অভিযোগ, ভোটার হয়েও তারা অদৃশ্য। একটু ডাঙার জায়গা, একটি স্থায়ী ঠিকানা পেলে সন্তানদের স্কুলে পাঠানো যেত। কিন্তু ঠিকানাহীন জীবনে স্কুলে ভর্তির ফরমই হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে বড় বাধা।
জলে ঘেরা জীবনে শিশুরা জন্মায় নৌকায়, বড় হয় রোদ-বৃষ্টিতে। অপুষ্ট শরীর আর চোখে স্থায়ী আতঙ্ক। দুর্যোগ এলে আশ্রয় মেলে না কোথাও। ডাঙা যেন অন্যদের জন্য, মান্তাদের জন্য নয়।
বরিশাল সদরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদীতীরের একটি নৌকায় কথা হয় তানজুয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, সন্তানের স্কুলে ভর্তি হতে ঠিকানা লাগে, লাগে মাটির ওপর মাথা গোঁজার একটি ঘর। সেই ঘর না থাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম আটকে যাচ্ছে নৌকাতেই।
ইলিয়াস মান্তা তিন বছর বয়সী ছেলেকে হারিয়েছেন নদীর পানিতে। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে সেই স্মৃতি বলতে গিয়ে। তিনি বলেন, একবার সরকার ঘর দিতে এসেছিল, কিন্তু তার জীবন তো ঘরে ধরা পড়ে না।
মান্তা সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা চন্দ্রদ্বীপ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আলী জীবন জানান, বরিশাল সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে তিন শতাধিক মান্তা পরিবার রয়েছে। এক হাজার দুই শতাধিক মানুষের মধ্যে ভোটার হয়েছেন মাত্র ৩৫০ জন। এ বছর নতুন করে যুক্ত হয়েছেন আরও ২৮ জন।
মেহেন্দিগঞ্জ, বাবুগঞ্জ, দপদপিয়া ফেরিঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় থাকা আরও চার শতাধিক মান্তা পরিবারের অবস্থাও একই। সব মিলিয়ে বরিশাল জেলায় তিন হাজারের বেশি মান্তা মানুষের মধ্যে ভোটাধিকার পেয়েছেন প্রায় অর্ধেক। তবু এই ভোটাররা কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী হিসাবের ভেতর জায়গা করে নিতে পারেননি।
সমাজসেবা দপ্তর জানিয়েছে, এই প্রথম মান্তা সম্প্রদায়ের ৫০ জন সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার আওতায় এসেছেন। তবে তাদের সঠিক সংখ্যা ও ভোটারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও নির্ধারিত হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক রফিকুল আলম মনে করেন, নদীর স্রোতের মতোই মান্তাদের ভোটাধিকার ভাসমান। তালিকায় নাম উঠলেও নাগরিক স্বীকৃতির জায়গায় তারা এখনও পৌঁছাতে পারেননি। ভোটাধিকার তাদের জীবনের চক্র ভাঙার সুযোগ এনে দিতে পারত, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
২০০৮ সালে ভোটাধিকার পেলেও নাগরিক সুবিধা মেলেনি মান্তা সম্প্রদায়ের। আড়িয়াল খাঁর স্রোত যেমন থামে না, মান্তাদের জীবনও তেমনি এক জায়গায় স্থির হয় না। কাগজে তারা নাগরিক, বাস্তবে এখনও নদীর মানুষ—যেখানে ভোটাধিকার আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই।











