দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জাল সনদের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সনদ যাচাই অভিযানে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলা-র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদন্ত চালিয়ে দেখা গেছে, কর্মরত ৬৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫৭ জনের সনদই প্রাথমিকভাবে জাল বলে শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্তাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম আপাতত প্রকাশ করা হয়নি।
ডিআইএ কর্মকর্তারা জানান, দুই পদ্ধতিতে সনদ যাচাই করা হচ্ছে—সরাসরি তথ্য যাচাই এবং কিউআর কোড স্ক্যানিং। সন্দেহজনক সনদ সংশ্লিষ্ট বোর্ড বা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। জাল প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বেতন বন্ধসহ অবৈধভাবে নেওয়া সরকারি অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে ১,৭৭২ জন জাল সনদধারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে ৩৩০ জন এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় ১৩৬ জনসহ মোট ৪৬৬ জনের জাল সনদ নতুন করে শনাক্ত হয়েছে।
হালুয়াঘাটের ওই প্রতিষ্ঠানে শুধু জাল সনদই নয়, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ এবং অনুমোদনহীন বিষয়ে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের মতো অনিয়মও পাওয়া গেছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিকে একাধিক পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ডিআইএ’র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রাথমিকভাবে অনেক অনিয়ম শনাক্ত হলেও সব তথ্য যাচাই করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট বোর্ড ও সংস্থার তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হওয়ায় প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়।
কর্মকর্তারা জানান, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) চালু হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে জালিয়াতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জাল সনদের উৎস চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ডিজিএফআই, এনএসআই এবং ডিএসবি-র তৎপরতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, জাল সনদ শনাক্তে নিয়মিত কাজ চলছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়ম বেশি সামনে আসছে। সন্দেহজনক সনদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লিখিতভাবে যাচাই করা হয়। জাল প্রমাণিত হলে তা নথিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরবর্তী ধাপে পাঠানো হয়।
তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত তা প্রকাশ করা যায় না। কারণ, একটি সনদ বা নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একাধিক সংস্থার যাচাই প্রয়োজন হয়। জনবল সংকট ও ফাইলজটের কারণেও ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হচ্ছে।
তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত ও কার্যকর প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মহলে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে শিক্ষা খাতে জালিয়াতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।











