মানুষ সাধারণত দুনিয়ার জীবনে সাফল্যের যে সংজ্ঞা কল্পনা করে, মহান আল্লাহর দরবারে তার মূল্যায়ন অনেক সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। পৃথিবীতে কেউ বীর, কেউ আলেম, কেউ দানবীর হিসেবে পরিচিত হন। সমাজ তাদের সম্মানের আসনে বসায় এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কিন্তু কিয়ামতের ময়দানে বিচার হবে মানুষের অন্তরের নিয়ত অনুযায়ী। সেখানে বাহ্যিক অর্জন, খ্যাতি বা প্রসিদ্ধি নয়; বরং অন্তরের উদ্দেশ্যই হবে আসল মানদণ্ড।
এই গভীর সত্যটি একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের বিচার হবে, তাদের একজন সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিলেন। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া নিয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দেবেন এবং সে সেগুলো স্বীকার করবে। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, ‘তুমি এসব নিয়ামতের বিনিময়ে কী করেছ?’
সে বলবে, ‘আমি আপনার পথে যুদ্ধ করেছি এবং শহীদ হয়েছি।’ তখন আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি যুদ্ধ করেছিলে যেন মানুষ তোমাকে বীর বলে।’ এরপর বলা হবে, ‘দুনিয়ায় তো তোমাকে তাই বলা হয়েছে।’ অতঃপর তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯০৫)
এরপর আনা হবে এমন এক ব্যক্তিকে, যিনি ইলম অর্জন করেছেন, মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং কোরআন তিলাওয়াত করেছেন। তাকেও আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দেবেন। তখন সে বলবে, ‘আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য ইলম শিখেছি, মানুষকে শিক্ষা দিয়েছি এবং কোরআন তিলাওয়াত করেছি।’ কিন্তু আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি ইলম অর্জন করেছিলে যেন মানুষ তোমাকে বড় আলেম বা কারি বলে।’ এরপর ঘোষণা করা হবে, ‘দুনিয়ায় তো তোমাকে তাই বলা হয়েছে।’ তারপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
এরপর আনা হবে এমন এক ধনী ব্যক্তিকে, যাকে আল্লাহ বিপুল সম্পদ দান করেছিলেন। সে বলবে, ‘আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য দান করেছি।’ তখন আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি দান করেছিলে যেন মানুষ তোমাকে দানবীর বলে।’ ঘোষণা করা হবে, ‘দুনিয়ায় তো তোমাকে তাই বলা হয়েছে।’ এরপর তাকেও টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।
এই হাদিস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্পষ্ট করে দেয়—নিয়তই আমলের প্রাণ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তো শুধু এই নির্দেশই পেয়েছিল যে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে একনিষ্ঠভাবে এবং তাঁর জন্য দ্বিনকে খাঁটি করবে।’ (সুরা : বাইয়্যিনাহ, আয়াত : ৫)
বাহ্যিকভাবে মহৎ ও মহান দেখানো আমলও যদি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় করি ছোট শিরককে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘তা হলো রিয়া।’ (মুসনাদ আহমদ)
রিয়া অর্থ হলো মানুষকে দেখানোর জন্য ইবাদত করা। এটি এমন এক সূক্ষ্ম ব্যাধি, যা নেক আমলকে ভেতর থেকে নষ্ট করে দিতে পারে। অনেক সময় মানুষ ভালো কাজ করলেও তার উদ্দেশ্য যদি মানুষের প্রশংসা লাভ করা হয়, তবে সেই আমল আখিরাতে কোনো মূল্য বহন করবে না।
তবে এখানে একটি আকিদাগত বিষয় মনে রাখা জরুরি। হাদিসে যাদের কথা এসেছে, তারা ঈমানদার হয়েও নিয়ত নষ্ট করার কারণে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি অন্তরে ঈমান ধারণ করে, তবে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে—এ কথা সরাসরি এই হাদিসে বলা হয়নি। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী চিরস্থায়ী জাহান্নাম মূলত কুফর ও শিরকের জন্য নির্ধারিত।
বর্তমান যুগে সাফল্যের ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। খ্যাতি, অনুসারী, প্রচার এবং মানুষের প্রশংসা অনেকের কাছে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেক সময় আমলও প্রদর্শনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কিয়ামতের ময়দানে কোনো অনুসারী, কোনো করতালি বা কোনো শিরোনাম কাজে আসবে না। সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—আমি যে কাজটি করেছি, তা কার সন্তুষ্টির জন্য করেছি?
এই হাদিস আমাদের আমলের ধরন পরিবর্তন করতে বলে না; বরং আমলের ভেতরের উদ্দেশ্যকে শুদ্ধ করতে শিক্ষা দেয়। শহীদ হওয়া, ইলম শিক্ষা দেওয়া এবং দান করা—সবই মহৎ কাজ। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে বিষয়টি মানুষের পরিণতি নির্ধারণ করবে, তা হলো একনিষ্ঠতা। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টিই লক্ষ্য হয়, তবে ছোট আমলও মহান হয়ে ওঠে। আর যদি মানুষের প্রশংসাই উদ্দেশ্য হয়, তবে বড় আমলও শূন্য হয়ে যেতে পারে।
কিয়ামতের সেই কঠিন দিনের আগে তাই প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা করা। আমরা যা করছি, তা কি সত্যিই আল্লাহর জন্য? নাকি মানুষের চোখে বড় হওয়ার জন্য? এই প্রশ্নের সৎ উত্তরই মানুষের আখিরাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।











