একটি ভালো কাজ আরেকটি ভালো কাজের সহায়ক—এই মৌলিক সত্যটি আমাদের জীবনচর্চার গভীরে প্রোথিত। নেক আমল যেমন নেক আমলের পথ প্রশস্ত করে, তেমনি একটি গুনাহ আরেকটি গুনাহের দুয়ার খুলে দেয়। একজন মানুষ যদি একটি পাপ কাজে লিপ্ত হয়, তবে সেই পাপকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাকে আরও বহু অন্যায়, মিথ্যা, প্রতারণা বা সহিংসতার আশ্রয় নিতে হয়।
ধরা যাক, কেউ কাউকে হত্যা করতে চায়। তখন তাকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে, পরিকল্পনা করতে হবে, অর্থ জোগাড় করতে হবে, গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে—এসবের প্রতিটি ধাপই আরেকটি গুনাহের জন্ম দেয়। অর্থাৎ একটি গুনাহ বহু গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঠিক তেমনি একটি নেক কাজও বহু নেক কাজের সূচনা করে। কেউ যদি নিয়ত করে কোনো দীনি মজলিশে অংশ নেবে, তাহলে সেখানে যাওয়ার জন্য পথ চলা, সময় বের করা, ধৈর্য ধরে বসে থাকা, মনোযোগ দিয়ে আলোচনা শোনা—এসব প্রতিটি কাজই আলাদা আলাদা নেক আমল। এরপর সে যদি ঘরে ফিরে শেখা বিষয় অনুযায়ী আমল করে এবং অন্যদেরও তা অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে সেই একটি নিয়ত থেকেই বহু নেক কাজের বিস্তার ঘটে।
মানুষের জীবনে এমন কিছু নেক আমল থাকে, যার প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ সৃষ্টি হয়। কেউ দান-সদকায় আগ্রহী, কেউ ইলম অর্জনে, কেউ ইবাদতে অধিক মনোযোগী। আখিরাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জন্য জান্নাতের বিভিন্ন দরজা নির্ধারণ করবেন। দুনিয়ায় যে আমলের প্রতি যার বেশি ভালোবাসা ও নিষ্ঠা ছিল, সে সেই আমলকারীদের নির্দিষ্ট দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য লাভ করবে।
অন্যদিকে পাপীদের অবস্থা হবে ভিন্ন। কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, সেদিন আল্লাহ ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন পাপীদের ও তাদের উপাস্যদের একত্রিত করতে। যারা দুনিয়ায় সূর্য, চন্দ্র, গাছ, পশু কিংবা মানুষের অন্ধ অনুসরণে লিপ্ত ছিল, তাদের সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। তখন তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে—তোমরা একে অপরকে সাহায্য করছ না কেন? কিন্তু সেদিন কারও কোনো বন্ধু বা সহায় থাকবে না।
হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র হবে যে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কষ্টও তার সামনে তুচ্ছ মনে হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মানুষ সেদিন এমন উদ্বেগ ও আতঙ্কে নিমজ্জিত থাকবে যে কেউ কারও দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পাবে না। প্রত্যেকে নিজের পরিণতি নিয়ে শঙ্কিত থাকবে।
সেদিন মানুষ একে অপরকে দোষারোপ করবে। সন্তান মা-বাবাকে, অনুসারী তার নেতাকে, ছাত্র তার শিক্ষককে অভিযুক্ত করবে—‘তুমি আমাকে বিভ্রান্ত করেছ।’ কিন্তু এসব অভিযোগ কোনো কাজে আসবে না। দুনিয়ায় যে ভুল পথ অনুসরণ করা হয়েছে, তার দায় নিজেকেই বহন করতে হবে।
অনেকেই মনে করে, কোনো ব্যক্তির অনুসরণ করলেই মুক্তি নিশ্চিত। কিন্তু প্রকৃত মুক্তি আসে নিজের আমল, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে। জান্নাতে প্রবেশ সহজ কোনো বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন বিশুদ্ধ নিয়ত, ধারাবাহিক নেক আমল এবং গুনাহ থেকে আন্তরিক তওবা।
সুতরাং আমাদের উচিত একটি ভালো কাজ দিয়ে জীবনের যাত্রা শুরু করা এবং সেই কাজকে আরও বহু ভালো কাজের সোপানে পরিণত করা। কারণ একটি নেক আমলই হতে পারে আখিরাতের মুক্তির প্রথম ধাপ।











