মানুষের জীবনে দোয়া কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি বান্দা ও রবের মধ্যে এক গভীর আত্মিক সংলাপ। যখন দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখনও দোয়ার দরজা খোলা থাকে। আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব।” (সূরা গাফির, আয়াত : ৬০)।
কিন্তু সব দোয়া সমান মর্যাদার নয়; কিছু দোয়া আল্লাহর দরবারে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ الْإِمَامُ الْعَادِلُ وَالصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ یَرْفَعُهَا اللهُ دُونَ الْغَمَامِ یَوْمَ الْقِيَامَةِ وَتُفْتَحُ لَهَا أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَیَقُولُ بِعِزَّتِي لَأَنْصُرَنَّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন ধরনের ব্যক্তির দোয়া রদ হয় না—
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক,
২. রোজাদার যতক্ষণ না ইফতার করে,
৩. মজলুমের দোয়া।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার দোয়া মেঘমালার ওপরে তুলে নেবেন এবং আসমানের দরজা খুলে দেবেন। আল্লাহ বলবেন, “আমার মর্যাদার শপথ! আমি তোমাকে সাহায্য করবো, যদিও একটু বিলম্ব হোক।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৭৫২)
এই হাদিসে রোজাদারের দোয়াকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তা গভীরভাবে লক্ষ্যণীয়। রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; এটি আত্মসংযম, তাকওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ।
একজন রোজাদার যখন দীর্ঘ সময় ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকে, তখন সে মূলত আল্লাহর নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ প্রকাশ করে। এই মুহূর্তে তার অন্তর নরম হয়, অহংকার ভেঙে যায়, আর দোয়া হয়ে ওঠে আন্তরিক। বিশেষ করে ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে রোজাদারের দোয়ার গ্রহণযোগ্যতা আলেমরা গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেছেন। কারণ এই সময় তার মধ্যে থাকে দীর্ঘ ইবাদতের ক্লান্তি, ধৈর্য ও আশাবাদ; সব মিলিয়ে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক অবস্থা।
রোজাদারের দোয়া সরাসরি আসমানের দরজায় কড়া নাড়ে। ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, রোজা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং দোয়াকে খাঁটি করে। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, রোজা এমন এক ইবাদত যা বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করে; তাই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমলগুলোও বিশেষ মর্যাদা পায়।
হাদিসের শেষাংশে আল্লাহর শপথবাক্য বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে। ‘আমার মর্যাদার শপথ’ এই ঘোষণা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি। সাহায্য তাৎক্ষণিক নাও আসতে পারে, কিন্তু বিলম্ব মানে প্রত্যাখ্যান নয়। বরং তা হতে পারে উত্তম সময়ের অপেক্ষা, অথবা আখিরাতের জন্য সঞ্চিত এক মহান পুরস্কার।
সুতরাং রোজাদারের জন্য শিক্ষা হলো—ইফতারের আগে সময়টিকে অবহেলা না করা। এই সময়টিকে শুধু খাবারের অপেক্ষায় নয়, বরং দোয়া, ইস্তিগফার ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ মনোযোগে কাটানো উচিত। হয়তো সেই মুহূর্তেই এমন একটি দোয়া কবুল হবে, যা তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই বদলে দিতে পারে।











