দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত বর্তমানে গভীর সংকটে। গত কয়েক বছরের সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতা, ১৬-১৭ শতাংশ উচ্চ সুদহার, তীব্র জ্বালানি সংকট এবং ডলারের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি উদ্যোক্তাদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। নতুন বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে কর্মসংস্থান কমছে, প্রকল্প স্থগিত হচ্ছে এবং বহু প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরিয়ে আনা না গেলে এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন না করলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.১ শতাংশে—গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। দেশের জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান ৭৮ থেকে ৮৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ এ খাতনির্ভর। অথচ উচ্চ সুদহারের কারণে নতুন ঋণ গ্রহণ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরে জিডিপি অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২.৪৮ শতাংশে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংক খাতে আস্থার সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সক্ষমতা হারানোর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। উচ্চ সুদহার ঋণের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যাসের ঘাটতির কারণে উৎপাদনশীলতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিও স্থানীয় ও রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা কমিয়েছে।
ডলারের মূল্য ১২২ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণ কার্যত থমকে গেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদাবাজি বৃদ্ধি ও ‘মব সংস্কৃতি’ শিল্প পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ব্যাংক খাতে মার্জার আতঙ্ক ও তারল্য সংকট ঋণপ্রবাহ আরও সীমিত করেছে।
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক অস্থিরতায় বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ ৬১.৫৩ শতাংশ কমেছে। শিল্প খাতে এর প্রভাব স্পষ্ট। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে এক লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।
উদ্যোক্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে শিল্প খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগের ঘাটতি ও আস্থাহীনতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশার বার্তা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা জানিয়েছেন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বন্ধ কারখানা সচল করার আশ্বাস দিয়েছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ হতে পারে, তবে মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সুদের হার কমানো, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কর প্রশাসনে সংস্কার এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করা সম্ভব নয়।
উদ্যোক্তারা এখন নতুন সরকারের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ ও বাস্তবসম্মত নীতির অপেক্ষায়। তাদের মতে, আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতি আবার গতি পাবে।











