উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর জেলা জয়পুরহাটে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দামের ভয়াবহ ধসে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। মাঠজুড়ে সোনালি আলুর স্তূপ, উৎপাদনে সন্তোষজনক সাফল্য—সবকিছু মিলিয়ে যেখানে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে এখন হতাশা, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তা। ফলন বেশি হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বিঘাপ্রতি গুনতে হচ্ছে বড় অঙ্কের লোকসান। অনেক কৃষকের আক্ষেপ—‘আলু চাষ করে যেন পাপ করেছি।’
কৃষক ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করতে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। উন্নতমানের বীজ কিনতেই খরচ হয়ে যায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। সার ও কীটনাশকে লাগে আরও ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। জমি প্রস্তুত, রোপণ, নিড়ানি, আগাছা পরিষ্কার ও উত্তোলনসহ শ্রম ব্যয়ে গুনতে হয় কমপক্ষে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
এর বাইরে সেচ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং পরিবহন, বাছাই, প্যাকেজিং ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে আরও কয়েক হাজার টাকা যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাই কম থাকায় এ বছর বিঘাপ্রতি ৭৫ থেকে ৮৫ মণ পর্যন্ত ফলন হয়েছে, যা উৎপাদনের দিক থেকে অত্যন্ত সন্তোষজনক।
কিন্তু সমস্যার শুরু বাজারে। পাইকারি বাজারে বর্তমানে কেজিপ্রতি দাম ৮ থেকে ১২ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। এতে বিঘাপ্রতি মোট বিক্রি দাঁড়াচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বেশি নয়। ফলে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
কালাই উপজেলার হাজিপাড়া মাঠে সরেজমিনে দেখা গেছে, নারী শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন আলু উত্তোলনের কাজে। প্রতি শতকে তিন থেকে সাড়ে তিন মণ ফলন হলেও কৃষকদের মুখে নেই আনন্দের ছাপ। মাঠের ফলন আর বাজারদরের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিশাল ফারাক। উৎপাদনের খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
কৃষক আব্দুল মজিদ জানান, গত বছর তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করে প্রায় ২৭ হাজার টাকা লোকসান হয়েছিল। সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই এ বছর দুই বিঘা জমিতে আবার আলু আবাদ করেন। সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিক ব্যয় মিলিয়ে তার মোট খরচ হয় ৬৫ হাজার টাকা। ফলন হয় ১৬০ মণ। কিন্তু প্রতিমণ মাত্র ২২০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় মোট বিক্রি হয়েছে ৩৫ হাজার ২০০ টাকা। প্রায় ৩০ হাজার টাকা লোকসান গুনে তিনি এখন দিশেহারা। তার আশঙ্কা, এমন অবস্থা চলতে থাকলে অনেক কৃষকই চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।
আরেক কৃষক ফিরোজ মিয়া জানান, গত বছর ছয় বিঘা জমিতে আলু আবাদ করে মৌসুমের শুরুতে দাম কম থাকায় লাভের আশায় সব আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বাজারদর না বাড়ায় সংরক্ষণ খরচসহ আরও লোকসান গুনতে হয়। এবার সাড়ে চার বিঘা জমিতে আবাদ করে তিনি কমপক্ষে এক লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন। তাই যেকোনো দামে এবার আলু বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মোলামগাড়ীহাট এলাকার কৃষক তসলিম উদ্দিন ধারদেনা করে পাঁচ বিঘা জমিতে এলুয়েন্ট ও রেনমি জাতের আলু লাগিয়েছেন। ফলন ভালো হলেও কম দামের কারণে উৎপাদন খরচ ওঠার সম্ভাবনা নেই। ঋণ পরিশোধ নিয়ে তিনি গভীর দুশ্চিন্তায় আছেন। পুনট এলাকার কৃষক মতিন আগাম জাতের আলু বিক্রি করেও বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লোকসান করেছেন। উদয়পুর এলাকার কৃষক ইদ্রিস আলী ২৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে প্রতিমণ ২৭০ টাকায় বিক্রি করছেন, তাতেও বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১৩ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। তিনি আলু রপ্তানি বাড়ানোর দাবি তুলেছেন।
এদিকে কালাই পৌরশহরের শিমুলতলীতে অবস্থিত একটি কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক জানান, গত বছর দাম কম থাকায় অনেক কৃষক আলু তুলতে আসেননি। এতে হিমাগার মালিকদেরও লোকসান হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার অর্ধেক ভাড়া আগাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংরক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা সেখানে আলু রাখতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
সবজি রপ্তানিকারক আব্দুল বাসেদ বলেন, দেশের অন্যান্য সবজি বিদেশে রপ্তানি হলেও আলুর রপ্তানি কার্যত নেই। কয়েক বছর আগে সরকার আলু রপ্তানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দিলেও বর্তমানে তা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদিত আলু পুরোপুরি দেশীয় বাজারেই থেকে যাচ্ছে। সরবরাহ বেশি থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে যাচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকেরা মিউজিকা, ডায়মন্ড, এস্টারিক্স, ক্যারেজ, কার্ডিনাল, রোজেটা, এলুয়েন্ট সানসাইন, ভ্যালেনসিয়া, রেনমি, গ্র্যানুলা, লেভান্তেসহ বিভিন্ন জাতের আলু আবাদ করেছেন। তবে উৎপাদনের তুলনায় সংরক্ষণ সুবিধা সীমিত। জেলায় ১৯টি হিমাগারে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ১০৪ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব, যা মোট উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আলুভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা, রপ্তানি বাড়ানো, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণের মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও রপ্তানির সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকলে বাম্পার ফলনও কৃষকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।











