রোজা বা সাওম এমন এক ইবাদত, যার শিকড় মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি শুধু ইসলামী শরিয়তের অংশ নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এটি আত্মসংযম, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতির এক অমূল্য প্রতীক।
ইমাম সুয়ুতি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, মানবজাতির প্রথম রোজাদার ছিলেন আদম (আ.)। তিনি প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখতেন আল্লাহর কাছে তাওবা কবুল হওয়ার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ। ইবনে আসাকির ও খতিব আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে এ বর্ণনা পাওয়া যায়। অন্য সূত্রে বলা হয় নুহ (আ.) প্রথম রোজাদার ছিলেন, মহাপ্লাবনের পর নৌকা থেকে নেমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি রোজা রাখতেন।
রোজার অন্য রূপ—‘কথা বলা থেকে বিরত থাকা’—ও ইতিহাসে বিদ্যমান। জাকারিয়া (আ.) ও মরিয়ম (আ.) এ ধরনের রোজা পালন করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা মরিয়ম (আ.)-এর সম্পর্কে বলেন, “অতএব, যদি তুমি কোনো মানুষকে দেখতে পাও, তবে বলো, আমি পরম করুণাময়ের উদ্দেশ্যে নীরব থাকার মানত করেছি, তাই আজ আমি কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না।” (সুরা: মরিয়ম, আয়াত: ২৬)
পূর্ববর্তী জাতির রোজাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অনুশাসন। কোরআনে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা: বাকারাহ, আয়াত: ১৮৩) ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বহু গ্রন্থে রোজার উল্লেখ রয়েছে।
মুসা (আ.) ৪০ দিন রোজা রাখতেন। খ্রিস্টধর্মেও ঈসা (আ.) ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। দাউদ (আ.)-এর রোজা সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে; তিনি এক দিন রোজা রাখতেন আর এক দিন ছেড়ে দিতেন। সকল নবী ও জাতির মধ্যে রোজা এক অভিন্ন আধ্যাত্মিক অনুশাসন হিসেবে প্রচলিত ছিল।
ইসলামের আবির্ভাবের পর দ্বিতীয় হিজরিতে (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়। নবী মুহাম্মদ (সা.) ইসলামী শরিয়তের আওতায় রোজা রাখার প্রথম ব্যক্তি ছিলেন। রমজানের রোজা খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও তাকওয়া অর্জনের এক মহৎ উপায়। আল্লাহ তাআলা রোজাকে বান্দা ও প্রভুর মধ্যকার একান্ত ইবাদত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার প্রতিদান তিনি নিজেই প্রদান করবেন।
রোজা শুধুমাত্র এক মাসের ইবাদত নয়; এটি আত্মসংযম, ধৈর্য ও তাকওয়ার এক অনন্ত শিক্ষা—যা মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যায় এবং হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে।











