রমজানে দিনভর সিয়াম সাধনার পর সূর্যাস্তের মুহূর্তটি একজন রোজাদারের জন্য বিশেষ রহমতের সময়। এ সময়টি শুধু খাদ্য গ্রহণের নয়; বরং দোয়া, শুকরিয়া ও ইবাদতের এক অনন্য ক্ষণ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইফতারের সময় কিছু নির্দিষ্ট আমল করতেন, যা উম্মতের জন্য সুন্নত ও অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে আছে।
১. সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতারে বিলম্ব করতেন না। সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ইফতার করতেন। তিনি বলেছেন—
আরবি:
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ:
لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ
উচ্চারণ:
লা ইয়াযালুন নাসু বিখাইরিন মা আজ্জালুল ফিতর।
অর্থ:
“মানুষ ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৫৭)
২. খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার শুরু করা
হজরত আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন—
আরবি:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُفْطِرُ عَلَى رُطَبَاتٍ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ رُطَبَاتٌ فَتَمَرَاتٌ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَمَرَاتٌ حَسَا حَسَوَاتٍ مِنْ مَاءٍ
অর্থ:
রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের আগে তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না পেলে শুকনা খেজুর, আর তাও না পেলে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন।
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৫৬)
৩. ইফতারের সময় দোয়া করা
ইফতারের সময় দোয়া কবুলের বিশেষ সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতারের সময় এই দোয়া পড়তেন—
আরবি:
ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
উচ্চারণ:
জাহাবায জামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল উ’রুকু, ওয়া ছাবাতাল আঝরু ইনশাআল্লাহ।
অর্থ:
“তৃষ্ণা দূর হয়েছে, শিরা-উপশিরা সিক্ত হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ সওয়াব স্থির হয়ে গেছে।”
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৫৭)
আরেক হাদিসে এসেছে—
আরবি:
إِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ دَعْوَةً لَا تُرَدُّ
অর্থ:
“রোজাদারের জন্য ইফতারের সময় এমন একটি দোয়া রয়েছে, যা প্রত্যাখ্যাত হয় না।”
(সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৭৫৩)
৪. অল্প খেয়ে মাগরিবের সালাত আদায় করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) হালকা কিছু দিয়ে ইফতার করতেন, তারপর মাগরিবের সালাত আদায় করতেন। এতে বোঝা যায়, ইবাদতকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন।
৫. অপচয় না করা ও সংযম অবলম্বন করা
আল-কুরআন-এ আল্লাহ তাআলা বলেন—
আরবি:
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا
উচ্চারণ:
ওয়া কুলু ওয়াশরাবু ওয়ালা তুসরিফু।
অর্থ:
“তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।”
(সুরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৩১)
৬. অন্যকে ইফতার করানো
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
আরবি:
مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ
অর্থ:
“যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।”
(সুনান তিরমিজি, হাদিস: ৮০৭)
ইফতার ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে সরল, সংযমী ও ইবাদতমুখী একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। দ্রুত ইফতার, খেজুর বা পানি দিয়ে শুরু, দোয়া পাঠ, সালাতকে অগ্রাধিকার এবং অপচয় পরিহার— এসবই তাঁর সুন্নাহ।
আজ আমাদের সমাজে ইফতার অনেক সময় আড়ম্বর ও অপচয়ের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। অথচ নববী আদর্শ আমাদের শেখায়— ইফতার হলো শুকরিয়া, দোয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার করার তাওফিক দান করুন। আমিন।











