কোরআনুল কারিমে পিতা-মাতার মর্যাদা, অধিকার ও তাঁদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে সুরা বনি ইসরাঈলের ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সন্তানের প্রতি এক অনুপম নৈতিক শিক্ষা ও দোয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন, যা ইসলামী পারিবারিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি।
আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন—
“অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।’”
এখানে ‘বিনয়াবনত থাকা’র মাধ্যমে গভীর অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে। তাফসিরকারগণ ব্যাখ্যা করেছেন, যেমন একটি পাখি তার ছানাদের লালন-পালনের সময় ডানা নত করে আগলে রাখে, তেমনি সন্তানেরও কর্তব্য পিতা-মাতার প্রতি সর্বদা নম্র, কোমল ও সহানুভূতিশীল থাকা। গর্ব, অহংকার কিংবা অবাধ্যতা পরিহার করে তাঁদের সঙ্গে আচরণ করতে হবে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে।
তাফসিরে ফাতহুল কাদীরে বর্ণিত হয়েছে—পাখি যেমন উড়ার সময় ডানা মেলে ধরে আর অবতরণের সময় ডানা গুটিয়ে নিজেকে নিচু করে নেয়, ঠিক তেমনিভাবে সন্তানকেও পিতা-মাতার সামনে নিজেকে নত ও বিনয়ী করতে হবে। উরওয়া ইবনে যুবাইর (রহ.) বলেন, এর অর্থ হলো—পিতা-মাতার নির্দেশ মান্য করা এবং তাঁদের কাঙ্ক্ষিত কোনো বৈধ বিষয়ে নিষেধ বা কষ্ট না দেওয়া।
আয়াতের শেষ অংশে যে দোয়ার কথা বলা হয়েছে—
“হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন”—এর তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক। ইবন কাসীর (রহ.) বলেন, সন্তানের পক্ষে পিতা-মাতার সব ত্যাগ ও ভালোবাসার পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সাধ্যানুযায়ী তাঁদের খেদমত করার পাশাপাশি আল্লাহ তাআলার দরবারে নিয়মিত দোয়া করতে হবে, যেন তিনি তাঁদের কষ্ট দূর করেন, বিপদ সহজ করেন এবং বার্ধক্য ও মৃত্যুকালে বিশেষ রহমত নাজিল করেন।
ইসলাম শুধু জীবিত অবস্থায় নয়, মৃত্যুর পরও পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক বজায় রাখার পথ খুলে দিয়েছে। তাঁদের জন্য দোয়া করা, সদকায়ে জারিয়া পৌঁছানো এবং নেক আমলের মাধ্যমে উপকার করা যায়। তবে শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী—পিতা-মাতা মুসলিম হলে তাঁদের জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দোয়া করা আবশ্যক। আর যদি মুসলিম না হন, তাহলে তাঁদের জীবদ্দশায় পার্থিব কল্যাণ ও ঈমান লাভের জন্য দোয়া করা যাবে; মৃত্যুর পর রহমতের দোয়া করা জায়েয নয়।
এই আয়াত ও তাফসির আমাদের শেখায়—পিতা-মাতার প্রতি বিনয়, আনুগত্য ও দোয়া শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নির্দেশ। পারিবারিক শান্তি, সামাজিক ভারসাম্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই শিক্ষার বিকল্প নেই।











