২৪ মে পড়ন্ত বেলায় লন্ডন ম্যারিয়ট হোটেলে চেকইন করেছি আমরা কজন। লন্ডনের পড়ন্ত বেলা মানে ঘড়িতে প্রায় ৮টা! একটু ফ্রেশ হয়ে লবিতে নামতে দেখা বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অধিনায়ক নাফিস ইকবালের সঙ্গে। তিনি তাড়া দিলেন, ‘ঘড়িতে দেখেন কটা বাজে, সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাবে!’ বাংলাদেশ জাতীয় দলের সঙ্গে ‘এ’ দলও তখন ইংল্যান্ডে।
শুরুতে এই খুচরা কথার কারণ মুশফিকুর রহিমের শততম টেস্ট উদ্যাপনের মঞ্চটা একটু মজবুত করা।
২০০৫ থেকে ২০২৫—দুই দশক ধরে বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটার টেস্ট খেলছেন, অবিশ্বাস্য ব্যাপার। গতকাল অবশ্য আরেক দফা চমকে দিয়েছেন মুশফিক। প্রত্যাশিতভাবে তিনি এমন ঐতিহাসিক অর্জনের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে আসেননি! কিন্তু দুপুরে ক্রীড়া সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে খুদে বার্তা, ‘মুশফিক ছবি তুলবেন সবার সঙ্গে, আপনারা মাঠে আসুন।’ দীর্ঘ ফটো সেশনের পুরোটা সময় হাসিমুখে ছিলেন তিনি।
তিনি মুশফিকুর রহিম, যাঁর শিশুমুখ দেখে শুরুতে খুব একটা পাত্তা দেননি ডেভ হোয়াটমোর। লন্ডনে ল্যান্ড করার পরদিন দুপুরে বাংলাদেশের তৎকালীন এই কোচের রুমে গেছি, যদি বাড়তি কোনো খবর পাওয়া যায়। বোর্ডের দেওয়া প্র্যাকটিসের টি-শার্ট আর শর্টসের মান নিয়ে গালমন্দ করা হোয়াটমোর বিমুখও করেননি, ‘বিলিভ মি সাইদ, আমি ছেলেটাকে চিনতাম না। অথচ কী দারুণ! গুড ফিউচার!’ তখন খালেদ মাসুদের ছায়ায় অন্য কোনো উইকেটকিপার-ব্যাটারের ভাবনা ছিল না বাংলাদেশ দলের।
সেখানে তৎকালীন প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ কেন এমন একটা ‘বাচ্চা ছেলে’কে ধরিয়ে দিলেন, মৃদু অসন্তোষ ছিল হোয়াটমোরের মনে। তখন ট্যুর ম্যাচ থাকত। প্রথম ম্যাচের একাদশে মুশফিকের তাই জায়গা হয়নি। তবে সাসেক্সের বিপক্ষে দ্বিতীয় ট্যুর ম্যাচের আগের দিন অনুশীলনের কথা বলছিলেন হোয়াটমোর, “নেটে আমি আরেকজনকে নিয়ে কাজ করছি। নেটের বাইরে কেউ একজন ‘নক’ করছিল, উল্টো দিকে ঘুরে থাকা আমি চমকে গিয়ে ভাবছিলাম, ‘ব্যাটে-বলের এমন সুইট সাউন্ড কোত্থেকে আসছে?’ ধীরে ধীরে ঘুরে দেখি মুশি!” এরপর সাসেক্সের বিপক্ষে দুই ইনিংসে ১৮ ও ৬৩ রানে টেস্ট অভিষেকের পথও করে নেন মুশফিকুর রহিম।
এরপর অবশ্য নর্দাম্পটনশায়ারের বিপক্ষেও অপরাজিত ১১৫ রানের ইনিংসে মুশফিক নিজের অভিষেক নিয়ে আর কোনো প্রশ্নই অবশেষ রাখেননি। সাসেক্স ম্যাচের পরই যা ঠিক হয়ে গিয়েছিল—২৬ মে মুশফিকের সঙ্গে লর্ডসে অভিষেক হচ্ছে পেসার শাহাদাত হোসেনেরও।
দুই দশক আগে বাংলাদেশ কেমন দল ছিল, প্রত্যাশা কী ছিল, তা এত দিন পর না বললেও চলে। ইংল্যান্ড আতিথ্য দিচ্ছে, তা-ও ক্রিকেটবিশ্বের ‘ঘর’ খ্যাত লর্ডসে, এই তো অনেক! আর সাংবাদিক হিসেবে প্রথম লর্ডসের বিখ্যাত প্রেস বক্সে বসে কাজ করা, সেটা আরো রোমাঞ্চকর। টস হলো, বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নামল। এরপর যা হওয়ার, তা-ই হতে থাকল। জাভেদ ওমর সবচেয়ে বেশি ২২ রান করলেন। ৬ নম্বরে নেমে মুশফিক ৫৬ বলে থামেন ১৯ রান করে। তাতেই বিখ্যাত ক্রিকেট সাংবাদিক শিল্ড বেরির প্রশংসাপত্র পেয়ে গেলেন মুশফিক। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক সাংবাদিকের কাছে এই ১৭ বছর বয়সী ক্রিকেটারের সম্পর্কে খুঁটিনাটি গভীর আগ্রহের সঙ্গে জেনেছিলেন তিনি। সত্যি বলতে, মুশফিক তখনো অনেকটাই অজানা। মিডিয়ায় বরং উল্টো আলোচনা, খালেদ মাসুদকে চাপে রাখতেই বুঝি নির্বাচকরা মুশফিককে দলে নিয়েছেন। বাড়ি বগুড়া বলে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন কি না, তখন এমন রাজনৈতিক অপপ্রচারও ছিল!
ঝট করে ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর মিরপুরের সবুজ গালিচায় মুশফিকের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়া যাবতীয় অপপ্রচারের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ হয়ে থাকবে ক্রীড়া বিষয়ক ছবির সংগ্রহশালায়। তবে আসল এবং একমাত্র লড়াইটা মুশফিকের একার। কুড়ি বছর আগে কৈশোরের উচ্ছলতা ছাপিয়ে নিজের খোলসবন্দি জীবন বেছে নেন তিনি। মিডিয়া এড়িয়ে গেছেন। এড়িয়ে গেছেন বললে কম বলা হবে, জানা-অজানা অনেক কারণে এই এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি মুশফিক মিডিয়াকে সরবে জানিয়ে দিয়েছেন! ক্রিকেট সার্কিটে এমনটা বিরল। মাঠের বাইরে অকারণ প্রতিপক্ষ দাঁড় করিয়ে খেলে যাওয়া কঠিন। কিন্তু মুশফিক তো দুই দশক পার করে দিলেন। মুশফিককে অপছন্দ করতে পারেন, তবে দেশের ক্রিকেট মানচিত্রে তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।
মুশফিকুর রহিমের ক্যারিয়ার এখন সবার চোখের সামনে নতুন ছবির মতো ঝকঝকে। তবে এই ছবি তৈরির পেছনের গল্প অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলাপরায়ণতার। এই বছর পাঁচ-ছয়েক আগেও নিয়মের অত কড়াকড়ি ছিল না। সেই সুযোগে মিরপুরের ড্রেসিংরুমে একদিন ঢুকে পড়েছি। তখন ক্যাম্প চলছিল, দিনের কার্যক্রম শেষ। তো, তৎকালীন জাতীয় দলের এক তারকা ইশারায় একটি নির্দিষ্ট চেয়ার দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘বলেন তো, ওখানে কে বসে?’ বলে নেওয়া ভালো, জাতীয় দলের সবার জন্য অলিখিতভাবে চেয়ার নির্দিষ্ট থাকে। যিনি যত সিনিয়র, তাঁর আসন তত পোক্ত। তাকিয়ে দেখি, সবকিছু অসম্ভব পরিপাটি। ম্যাচ ডে-তে নাকি আরো গোছানো থাকে মুশফিকুর রহিমের চেয়ার, গিয়ার্স, তোয়ালে—সব।
প্র্যাকটিসে অবিশ্বাস্য একনিষ্ঠতা, রানের ক্ষুধার সঙ্গে ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার এই ছোট ছোট ব্যাপার মিলিয়েই মুশফিকুর রহিমের লর্ডস টু মিরপুরের এই দীর্ঘ জার্নি। বর্ণাঢ্য এই অভিযাত্রা উদ্যাপনে মুশফিকের সঙ্গী আমরাও।
লেখাঃ কালের কন্ঠ।











