মসজিদ মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। নামাজ, ইবাদত, শিক্ষা ও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মসজিদের ভূমিকা অপরিসীম।
অসংখ্য মসজিদের মধ্য থেকে কোরআন মাজিদে অল্প কয়েকটি মসজিদের উল্লেখ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। কোথাও আল্লাহ তাআলা মসজিদের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন, কোথাও এর উদ্দেশ্য ও চরিত্র নির্ধারণ করে দিয়েছেন, আবার কোথাও ভ্রান্ত উদ্দেশ্যে নির্মিত মসজিদের কঠোর নিন্দা করেছেন।
কোরআনে ‘মসজিদ’ শব্দটি ও এর বিভিন্ন রূপ প্রায় ২৮ বার এসেছে। একবচন রূপ এসেছে ২২ বার এবং বহুবচন রূপ এসেছে ছয়বার। কোরআনে এই শব্দটি মূলত দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমত, সিজদার স্থান হিসেবে—অর্থাৎ স্থাপিত নামাজখানা বা ইবাদতকেন্দ্র হিসেবে। যেমন পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহর মসজিদ, যেখানে তাঁর নাম বেশি পরিমাণে স্মরণ করা হয়।’ (সুরা হজ: ৪০)। দ্বিতীয়ত, মানুষের সিজদার অঙ্গ হিসেবে—যে অঙ্গগুলো দিয়ে মানুষ আল্লাহর জন্য সিজদা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সিজদার অঙ্গগুলো আল্লাহরই জন্য, অতএব আল্লাহর সঙ্গে কাউকে ডেকো না।’ (সুরা জিন: ১৮)।
কোরআনে বর্ণিত মসজিদগুলোর উল্লেখ মূলত দুইভাবে এসেছে। কিছু মসজিদের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন—মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল আকসা। আবার কিছু মসজিদের কথা এসেছে ইশারা-ইঙ্গিতে, যেমন—মসজিদে কুবা, মসজিদে দিরার এবং আসহাবে কাহাফের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মসজিদ।
কোরআনে সবচেয়ে বেশি যে মসজিদের কথা এসেছে, তা হলো মসজিদুল হারাম। কখনো ‘আল-মাসজিদুল হারাম’, কখনো ‘আল-বাইত’, আবার কখনো ‘আল-কাবা’ নামে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মক্কা নগরীতে অবস্থিত এই মসজিদের কেন্দ্রে রয়েছে কাবা শরিফ, যা নবী ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে নির্মাণ করেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তি উঁচু করছিলেন।’ (সুরা বাকারা: ১২৭)। আল্লাহ এই ঘরকে মানবজাতির জন্য প্রথম ইবাদতকেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন—‘নিশ্চয়ই মানুষের জন্য স্থাপিত প্রথম ঘরটি হলো বাক্কায় (মক্কায়), যা বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়েত।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৬)।
জাহেলি যুগে কাবা শরিফে অসংখ্য মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কাবাকে শিরকমুক্ত করেন এবং তাওহিদের কেন্দ্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
কোরআনে সরাসরি নাম করে উল্লেখিত দ্বিতীয় মসজিদ হলো আল-মাসজিদুল আকসা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় নিয়ে গিয়েছিলেন আল-মাসজিদুল হারাম থেকে আল-মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি।’ (সুরা ইসরা: ১)। ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদে আকসা ইসলামের তিনটি পবিত্রতম মসজিদের একটি। এটি ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা। ইসরা ও মিরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানেই সব নবীর ইমামতি করেন।
সুরা তাওবার এক আয়াতে আল্লাহ এমন এক মসজিদের কথা বলেন, যার ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর স্থাপিত। মুফাসসিরদের মতে, এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে মসজিদে কুবার দিকে। মসজিদে কুবা ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নির্মিত মসজিদ। হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। হাদিসে এসেছে, এখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলে একটি ওমরাহর সওয়াব পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, কোরআনে ভ্রান্ত উদ্দেশ্যে নির্মিত মসজিদেরও কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। সুরা তাওবায় উল্লিখিত মসজিদে দিরার নির্মিত হয়েছিল মোনাফেকদের দ্বারা—মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্যে। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেন এবং রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে সেই মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়।
এ ছাড়া সুরা কাহাফে আসহাবে কাহাফের ঘটনার প্রসঙ্গে একটি মসজিদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাদের মৃত্যুর পর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা কোরআনে সংক্ষেপে উল্লেখিত হয়েছে।
কোরআনে আলোচিত এসব মসজিদ শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং এগুলো ঈমান, তাকওয়া, ঐক্য ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের জীবন্ত দলিল।











