শীত নামলেই বরিশালের গ্রামাঞ্চলে বদলে যায় প্রকৃতির রঙ। ভোরের আলো ফুটতেই বিস্তীর্ণ মাঠ ঢেকে যায় সরিষার হলুদে। বাতাসে মিষ্টি গন্ধ, আর সারি সারি গাছ নীরবে জানিয়ে দেয়—তেলবীজের মৌসুম এসেছে। কৃষকের কাছে সরিষা মানে বাড়তি আয়, ভোজ্যতেল ও খৈলের নিশ্চয়তা।
তবে সরিষা ক্ষেত থেকে মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। বরিশালের অধিকাংশ সরিষা ক্ষেতে মৌবাক্সের উপস্থিতি খুবই কম, ফলে মৌচাষ বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে সীমাবদ্ধ। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৬,৮০০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে, যেখানে মৌমাছির উপস্থিতি থাকলে মানসম্মত মধু উৎপাদন সম্ভব।
রাকুদিয়া গ্রামে কয়েকজন কৃষক সরিষা ক্ষেতের ধারে কাঠের মৌবাক্স বসিয়ে সফল মৌচাষ শুরু করেছেন। দুই মাসের মৌসুমে তারা লক্ষাধিক টাকার মধু সংগ্রহ করেন। কৃষিবিদরা বলছেন, মৌমাছির পরাগায়নে সরিষার ফলন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে; সুষ্ঠু মৌচাষ ব্যবস্থাপনায় তা ২০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব। অর্থাৎ একই জমি থেকে তেলবীজ ও মধু—দুই ধরনের লাভ অর্জন সম্ভব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল অঞ্চলের উপপরিচালক মোসাম্মাৎ মরিয়ম আক্তার জানান, সরিষা ফুলের স্থায়িত্ব দুই মাস হলেও সারা বছর মৌমাছির খাদ্য জোগাতে পর্যাপ্ত ফলদ বা ফুলের বাগান না থাকায় মৌচাষ টিকিয়ে রাখা কঠিন। রানি মৌমাছি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ বেশি হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকি নিতে চান না।
স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ধীরে ধীরে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। যারা মৌবাক্স বসানো ক্ষেতে ভালো ফলন দেখেছেন, তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাবছেন। তবে প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক পুঁজি ও সরকারি সহায়তার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নলিন বাজার সংলগ্ন হেমনগরের মৌচাষি মো. আয়নাল হোসেন মৌসুমভিত্তিকভাবে বরিশালে আসেন। তার ‘মেসার্স মুন্না মৌ খামার’-এর ভ্রাম্যমাণ মৌবাক্স বাবুগঞ্জের সরিষা ক্ষেতে অবস্থান করছে। মৌসুম শেষে সরিষা ফুল ঝরে গেলে তিনি বাক্স নিয়ে যান ফরিদপুরে, কালোজিরার মধু সংগ্রহে। সারা বছর তিনি ফুলের খোঁজে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান।
গবেষক কবি হেনরী স্বপন মনে করছেন, সরিষার হলুদ প্রান্তরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যখন তেলবীজের সঙ্গে মধু প্রায় ‘বিনামূল্যে’ পাওয়া সম্ভব, তখন এই সুযোগ কাজে লাগাতে দেরি কেন? বরিশালের মাঠ সম্ভাবনার কথা বলছে; প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও সমন্বিত সহায়তা। তাহলে শীতের হলুদ মাঠে মৌমাছির গুঞ্জন নতুন অর্থনীতির সুর হয়ে উঠতে পারে।











