নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়াকে বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এই বিষয়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি অপরিহার্য বলে মনে করছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে এ ঘটনায় উচ্চ আদালতের স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছে আসক।
এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংগঠনটি জানায়, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেয় এবং ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড কিংবা আচরণের শিকার করা যাবে না। একজন বিচারাধীন বন্দি হিসেবে সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন।
অথচ তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মৃত্যুজনিত চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলেও তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। এমনকি জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগও দেওয়া হয়নি, যা কার্যত তার প্রতি অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ বলে উল্লেখ করেছে আসক। সংস্থাটির মতে, এটি সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সরাসরি ব্যত্যয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। সেখানে বলা হয়েছে, ভিআইপি বা অন্যান্য শ্রেণির কয়েদি বা হাজতির নিকটাত্মীয়—যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। এই নীতিমালা প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হলেও তা ইচ্ছামতো, নির্বিচারে বা কোনো যুক্তি প্রকাশ না করে প্রত্যাখ্যান করা যায় না।
আসকের মতে, পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন থাকা সত্ত্বেও এ বিধান প্রয়োগ না করা আইনের উদ্দেশ্য ও ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। আন্তর্জাতিক আইনেও এ ধরনের অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর) মেনে চলে, তার অনুচ্ছেদ ৭-এ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অনুচ্ছেদ ১০(১)-এ স্বাধীনতাবঞ্চিত সকল ব্যক্তির সঙ্গে মানবিকতা ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণের কথা বলা হয়েছে।
কারাফটকে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য মৃত স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মুখ দেখিয়ে একজন শোকাহত বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়া থেকে বঞ্চিত করা আইসিসিপিআর-এর এসব বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে উল্লেখ করেছে আসক।
সংস্থাটি আরও বলছে, কোনো আইন, বিধি বা নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও কেন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি—তা জানার অধিকার দেশের নাগরিকদের রয়েছে। আইনের শাসন কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণেই সীমাবদ্ধ নয়; সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণের গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে বলেও মন্তব্য করা হয়।
উল্লেখ্য, যশোর কারাগারে বন্দি রয়েছেন বাগেরহাট সদর উপজেলার ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। তার স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে বাগেরহাট প্রশাসনের কাছে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়নি। মানবিক দিক বিবেচনায় যশোর জেলা প্রশাসন ও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।











