অন্তর্বর্তী সরকারের আট উপদেষ্টা ও দুই সচিবের বিরুদ্ধে ‘সীমাহীন দুর্নীতি’র প্রমাণ নিজের কাছে রয়েছে—এমন দাবি করে গত বছর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। তিনি তখন উপদেষ্টাদের নাম প্রকাশ না করেই এ অভিযোগ করেন।
যে সময় তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন, তখন তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় এসেছে তাঁর সেই বক্তব্য। বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে—যে আট উপদেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি দুর্নীতির প্রমাণ থাকার দাবি করেছিলেন, তাদের নাম কি প্রকাশ করা হবে এবং এ বিষয়ে তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে করার পর এর দালিলিক প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া উচিত। তাদের মতে, অভিযোগটি সত্য হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, আর যদি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না থাকে তবে তা পরিষ্কার করা দরকার।
গত বছরের ৮ আগস্ট রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও আগামী দিনের জনপ্রশাসন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবদুস সাত্তার প্রথম এ অভিযোগ তুলেছিলেন। তিনি বলেন, প্রমাণ ছাড়া তিনি কোনো কথা বলেন না এবং এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনও রয়েছে।
ওই বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং তাদের ঘনিষ্ঠদের ব্যাংক হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাওয়া গেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে উপদেষ্টাদের প্রভাব রয়েছে এবং সমঝোতা ছাড়া অনেক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না।
সেই বক্তব্যে কয়েকজন উপদেষ্টার কর্মদক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার অভিজ্ঞতার অভাবের কথা উল্লেখ করেন। একইভাবে স্থানীয় সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টার অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।
দুর্নীতির বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি তখন বলেন, ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। তাই দুর্নীতির বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, অনেকের মতে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের দুর্নীতির পরিমাণ আগের ১৫ বছরের দুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে—যা দেশের জন্য বড় ধরনের অপবাদ।
এই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মহল থেকে ওই আট উপদেষ্টার নাম প্রকাশের দাবি ওঠে এবং অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
তবে পরদিন সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ওই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, অজ্ঞাতনামা উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে এবং যদি কোনো প্রমাণ থাকে তবে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এক বিবৃতিতে বলেন, আবদুস সাত্তারের বক্তব্য তার ব্যক্তিগত মতামত এবং এর সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রশাসন ক্যাডারের ’৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা এ বি এম আবদুস সাত্তারকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুগ্ম সচিব থাকাকালে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে ভূতপূর্ব সচিব পদে পদোন্নতি দেয়। পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান।
বর্তমানে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে তার আগের সেই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন মহল মনে করছে, যদি সত্যিই এমন দুর্নীতির প্রমাণ থেকে থাকে তবে তা প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত শুরু করা উচিত। এতে বিষয়টি পরিষ্কার হবে এবং জনমনে থাকা প্রশ্নেরও উত্তর পাওয়া যাবে।











