বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আলজাজিরাকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দলটির প্রধান বা আমির পদে কোনো নারী কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তার ভাষায়, এটি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং ‘আল্লাহ প্রদত্ত সৃষ্টিগত পার্থক্যের’ কারণেই নারীদের পক্ষে জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে থাকা সম্ভব নয়।
আলজাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনের নেওয়া এই সাক্ষাৎকারে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ইসলামী আইন প্রয়োগ, নারী অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কসহ বহু বিতর্কিত ও সংবেদনশীল বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান।
সাক্ষাৎকারে আলজাজিরার পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়—নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াতের সম্ভাব্য উত্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে কি না, বিশেষ করে দলটি যেহেতু ইসলামী আইন দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলে থাকে। উত্তরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী দেশের প্রচলিত আইনের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং জনগণের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। তার দাবি, দুর্নীতি দমন, স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষাই জামায়াতের মূল লক্ষ্য।
ইসলামী আইন চালু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষমতায় এলে তিনি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না; বরং সংসদেই বিষয়টি নির্ধারিত হবে। সংসদ যদি মনে করে দেশের উন্নতির জন্য ইসলামী আইন প্রয়োজন, তখন সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত আসবে।
নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব নিয়ে সমালোচনার জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি নারীদের কাজ বন্ধ করার কথা বলেননি। বরং সন্তান ধারণ, জন্মদান ও লালন-পালনের সময় নারীদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের বিশেষ সম্মান দেখানো উচিত—এমন কথাই তিনি বলেছেন। তার মতে, একজন মা যখন একই সঙ্গে সন্তান লালন ও পূর্ণ কর্মঘণ্টায় কাজ করতে বাধ্য হন, তখন সেটি ন্যায়সংগত হয় না। এ বক্তব্য ঘিরে যে প্রতিবাদ হয়েছে, তাকে তিনি ‘নগণ্য’ বলে মন্তব্য করেন।
নির্বাচনে নারী প্রার্থী না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জামায়াত আমির বলেন, এবারের সংসদ নির্বাচনে দলটি কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। তবে এটি নারীদের প্রতি অসম্মান নয়। তার ভাষায়, ভবিষ্যতের জন্য দল নারীদের প্রস্তুত করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইতোমধ্যেই জামায়াতের নারী প্রার্থীরা অংশ নিয়েছে এবং সাফল্যও পেয়েছে। সময় হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
তবে জামায়াতের প্রধান পদে নারীর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “এটা সম্ভব নয়। কখনোই সম্ভব নয়।” তিনি যুক্তি দেন, আল্লাহ পুরুষ ও নারীকে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব ও সক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যেমন—পুরুষ সন্তান জন্ম দিতে পারে না, স্তন্যদান করতে পারে না। একইভাবে নেতৃত্বের কিছু দায়িত্ব আছে, যা নারীদের পক্ষে সব সময় পালন করা সম্ভব নয়। তার মতে, একজন মা যখন সন্তান জন্ম ও লালন-পালনের দায়িত্বে থাকেন, তখন সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়িত্ব নেওয়া তার জন্য বাস্তবসম্মত নয়।
আলজাজিরার পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি হিসেবে বলা হয়—বাংলাদেশে টানা তিন দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং বিশ্বের বহু দেশেই নারীরা রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিয়েছেন। জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত কখনো নারী নেত্রীদের বিরুদ্ধে অসম্মানজনক অবস্থান নেয়নি। তবে তার দাবি, বিশ্বব্যাপী নারীদের নেতৃত্ব এখনো সীমিত, আর জামায়াত তাদের নিজস্ব আদর্শ ও কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়।
সাক্ষাৎকারে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রসঙ্গেও প্রশ্ন ওঠে। ডা. শফিকুর রহমান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, জামায়াতে ইসলামী কোনো নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত ছিল না। তার দাবি, যুদ্ধাপরাধের বিচার ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও বিতর্কিত। তবে তিনি স্বীকার করেন, মানুষ দিয়ে গঠিত সংগঠন হিসেবে জামায়াতের পক্ষ থেকে কেউ ভুল করে থাকলে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, তারা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক সম্পর্ক চায়। শেখ হাসিনাকে ভারত ফেরত না পাঠালেও বিষয়টি সংলাপের মাধ্যমে সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সবশেষে তরুণদের প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পরিবর্তন আসবে কি না—তা জনগণই ঠিক করবে। তার দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষে রায় দিয়ে তরুণরা প্রমাণ করেছে, তারা জামায়াতের আদর্শে আস্থা রাখে এবং মনে করে এই ধারাই নারীদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।











