সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সমালোচনার পর এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওই সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার নিরাপত্তা শঙ্কা। মব সহিংসতা ও জনরোষের আশঙ্কায় তারা সরকারি বাসভবন ছাড়তে অনীহা প্রকাশ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দায়িত্ব পালনকালে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা নাগরিকদের মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও ১৮ মাসের শাসনামলে নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) গত ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, গত ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মতো বহু ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে মব সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের ব্যবহার, রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রেপ্তার ও বিচারহীন আটক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়কালে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনায় ৬০ জনের প্রাণহানি ঘটে। কারাগারে মারা যান ১২৭ জন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক বন্দিও ছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলার কিছু উন্নতি হলেও সাবেক কয়েকজন উপদেষ্টা মনে করছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সৃষ্ট জনঅসন্তোষ তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে তারা সরকারি বাসভবনে অবস্থান অব্যাহত রাখতে চাইছেন, কারণ সেখানে নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সাবেক উপদেষ্টাদের দীর্ঘদিন সরকারি বাসভবনে রাখার পক্ষে নয়। চলতি মাসের মধ্যেই বাসা ছাড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে এক থেকে দুই মাস সময় দেওয়া হতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
আবাসন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাবেক উপদেষ্টাদের আবাসনসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই এবং তারা পেনশন সুবিধাও পান না। তাই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অবহিত করা হয়েছে।
তথ্যমতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস চলতি ফেব্রুয়ারির মধ্যেই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ছেড়ে নিজ বাসভবনে উঠবেন। জুলাই আন্দোলনের পর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন।
বর্তমান সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের আবাসনের জন্য মিন্টো রোড ও হেয়ার রোড এলাকায় মোট ২৪টি বাংলো ও ১২টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। আবাসন পরিদপ্তর সেগুলো সংস্কার করে দ্রুত বরাদ্দ দিতে চায়। ইতোমধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার ২১ জন বাসার জন্য আবেদন করেছেন।
কিন্তু মোট বরাদ্দযোগ্য বাসা ৩৭টি হওয়ায় সবার আবাসন নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ৪৯ জন, এছাড়া উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী মিলিয়ে আরও অনেকে রয়েছেন। ফলে কাকে কোন বাসা দেওয়া হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আলোচনা চলছে।
আবাসন পরিদপ্তর জানিয়েছে, সবাই সরকারি বাসা চাইবেন না—এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই ধাপে ধাপে বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে একদিকে সাবেক উপদেষ্টাদের নিরাপত্তা শঙ্কা, অন্যদিকে সরকারি আবাসন ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা—দুই বাস্তবতাই এখন প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।











