নেপালে সরকার পতনের পর আজ বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) অনুষ্ঠিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জেরে তৎকালীন সরকারের পতনের পর এই নির্বাচনকে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম বড় পরীক্ষার মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত বছরের আন্দোলনে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত জনচাপের মুখে সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং দেশটিতে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠিত হয়।
সরকার পতনের পর থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তারা ছয় মাসের মধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই আজকের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নির্বাচনে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটার অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ভোটার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোটারদের সুবিধার্থে কিছু ভোটকেন্দ্র নির্ধারিত সময়ের পরও খোলা রাখা হতে পারে। অতীতেও কিছু আসনে রাত পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলার নজির রয়েছে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের মোট ২৭৫ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। এর মধ্যে ১৬৫ জন সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতিতে, যেখানে কোনো আসনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থী বিজয়ী হন। বাকি ১১০ জন নির্বাচিত হবেন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয়ভাবে কত শতাংশ ভোট পেয়েছে তার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হয়।
এই দ্বৈত পদ্ধতির কারণে কোনো একক দলের পক্ষে সংসদে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নির্বাচনের পর সম্ভাব্যভাবে জোট সরকার গঠনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এবারের নির্বাচনে তিন হাজার চার শতাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের মধ্যে এক হাজারের বেশি প্রার্থীর বয়স ৪০ বছরের নিচে।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ। তিনি কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র এবং এবার ঝাপা-৫ আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ঐতিহ্যগতভাবে এই আসনটি অলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় এই লড়াইকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অলি ও তার সরকারকে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাপক জনবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে।
বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টির পক্ষে। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য। অনেকেই মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে তার দল উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারে এবং তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নেপালের রাজনীতিতে ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী দল নেপালি কংগ্রেসও এবার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে। দলটির নেতৃত্বে আছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ গগন থাপা। এর পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল) এবং সাবেক মাওবাদী নেতা প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন আরেকটি কমিউনিস্ট দলও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
রাজধানী কাঠমান্ডু উপত্যকার ১৫টি আসনের ফলাফলের দিকেও বিশেষ নজর রয়েছে। শহরাঞ্চলের ভোটের প্রবণতা সাধারণত জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করা হয়।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোট গণনা শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের ফল প্রকাশ করা হতে পারে। তবে পাহাড়ি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ এবং গণনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগতে পারে।
নেপালের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় অনেক ভোটকেন্দ্র দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। এসব এলাকা থেকে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করে গণনা কেন্দ্রে পৌঁছাতে কখনো মানুষের কাঁধে করে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়, আবার কখনো হেলিকপ্টার বা বিমানের সাহায্য নিতে হয়।
অনেক দূরবর্তী এলাকায় সন্ধ্যার পর বিমান বা হেলিকপ্টার চলাচল সম্ভব না হওয়ায় ব্যালট সংগ্রহের কাজ প্রায়ই পরদিন সকাল পর্যন্ত বিলম্বিত হয়। আবহাওয়াজনিত সমস্যাও গণনা প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় ইস্যু দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা। গত বছরের আন্দোলনে ৭৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। অনেক বিক্ষোভকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হন এবং উত্তেজিত জনতা সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে।
এই পরিস্থিতির পর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আগের সরকারের পতনের পেছনে যে জনঅসন্তোষ কাজ করেছিল, তার প্রতিফলনই এবারের নির্বাচনের মূল ইস্যুতে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই নির্বাচনকে শুধু নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকে নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলো পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ নেপালের নতুন সরকার ভবিষ্যতে আঞ্চলিক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।











