অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের গভীর জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত ক্ষুদ্র শহর ‘লিকোলা’। জনসংখ্যা মাত্র পাঁচজন হলেও জ্বালানি, খাবার ও বিশ্রামের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এই শহরটি। এবার পুরো শহরটাই বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে, যা ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ।
মেলবোর্ন থেকে গাড়িতে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় লিকোলায়। কয়েকটি আবাসিক ভবন, একটি জেনারেল স্টোর, একটি ক্যারাভান পার্ক এবং একটি পেট্রল পাম্প নিয়ে গঠিত শহরটি অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ছোট শহরগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। তবে এমন ঐতিহাসিক ও আবেগঘন শহর বিক্রির সিদ্ধান্তে স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের মানুষজন বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।
লিকোলা মূলত ১৯৫০-এর দশকে একটি টিম্বার মিলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। ১৯৬৮ সালে করাতকল বন্ধ হয়ে গেলে পুরো এলাকাটি অধিগ্রহণ করে লায়ন্স ক্লাব। পরে এটি একটি দাতব্য ক্যাম্পে রূপান্তর করা হয়, যেখানে স্কুল ছুটির সময় সুবিধাবঞ্চিত শিশু, তরুণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা অবস্থান করতেন। ক্যাম্পের পাশেই গড়ে ওঠে জেনারেল স্টোর ও ক্যারাভান পার্ক।
বর্তমানে শহরটির একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা লিয়েন ও’ডোনেল ও তার পরিবার। তিনি ২০২২ সালে জেনারেল স্টোরের দায়িত্ব নেন এবং ধীরে ধীরে শহরটিকে সবার জন্য এক ধরনের ‘বাড়ি’ হিসেবে গড়ে তোলেন। স্থানীয় ট্রাকচালক থেকে শুরু করে জরুরি সেবাদানকারী সংস্থার সদস্য—সবার কাছেই তিনি প্রধান যোগাযোগের ব্যক্তি।
তবে সম্প্রতি জানা যায়, লায়ন্স ভিলেজ লিকোলা বোর্ড গত বছরের শেষ দিকে নীরবে অনলাইনে পুরো শহরটি বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করেছে। বিক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ৬ মিলিয়ন থেকে ১০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মধ্যে। বোর্ডের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, বর্ধিত ব্যয় ও বীমা খরচ, ভবনগুলোর জীর্ণ অবস্থা এবং ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে তারা।
এই সিদ্ধান্তের ফলে উচ্ছেদের মুখে পড়েছেন ও’ডোনেল। ইজারা চুক্তির কারণে আইনগতভাবে বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তেমন কিছু করার সুযোগও তার নেই। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, শহরটি কোনো ডেভেলপারের হাতে গেলে এর প্রকৃত চরিত্র ও মানবিক রূপ হারিয়ে যাবে।
লিকোলা বিক্রির খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শহরটি রক্ষা, দোকান চালু রাখা এবং ইজারা নবায়নের দাবিতে চালু করা অনলাইন পিটিশনে ইতোমধ্যে ৮ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। পাশাপাশি লায়ন্স ক্লাবের বিভিন্ন রাজ্যের সদস্যরাও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচ বাসিন্দার এই ছোট্ট শহরটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। লিকোলা থাকবে কি না—নাকি হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়, সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।











