গ্রেপ্তার ও হয়রানির আশঙ্কায় ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা হাসপাতালে না গিয়ে গোপনে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারি ও দমন-পীড়নের কারণে আহত অনেক বিক্ষোভকারী চিকিৎসা নিতে ভয় পাচ্ছেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, চলমান অস্থিরতায় এ পর্যন্ত তিন হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য কিংবা ‘দাঙ্গাবাজদের’ হামলায় নিহত পথচারী। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তারা ছয় হাজার ৩০১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ জন শিশু, ৫০ জন পথচারী এবং ২১৪ জন সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। আরও ১৭ হাজারের বেশি মৃত্যুর তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এইচআরএএনএ ধারণা করছে, অন্তত ১১ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন। অনেকেই গ্রেপ্তারের ভয়ে হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে বা গোপন স্থানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আহতদের সহায়তায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবীদের একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা বিবিসিকে জানান, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন এবং মেডিকেল রেকর্ড নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে আহত বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করা যায়। এ কারণে অনেক চিকিৎসক রেকর্ডে গুলির ক্ষত বা সংঘর্ষজনিত আঘাতের উল্লেখ এড়িয়ে যাচ্ছেন।
ইসফাহানে এক বিক্ষোভে আহত একজন (ছদ্মনাম তারা) জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিনি ও তার বন্ধু আহত হন। হাসপাতালে নেওয়া হলে গ্রেপ্তার হতে পারেন—এই আশঙ্কায় তারা একটি দম্পতির বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং পরে পরিচিত এক চিকিৎসকের মাধ্যমে গোপনে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসক সতর্ক করে দেন, শরীরে থাকা কিছু গুলি ভবিষ্যতে অপসারণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
তেহরানের এক সার্জন নিমা বলেন, জানুয়ারির শুরুতে তিনি রাস্তায় বহু আহত তরুণকে পড়ে থাকতে দেখেছেন এবং গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়েই তাদের হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। তিনি জানান, টানা ৯৬ ঘণ্টা ঘুমহীন অবস্থায় অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে চিকিৎসকদের, অনেকের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থায়ী অক্ষমতা দেখা দিয়েছে।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের তথ্যমতে, বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতাল জানিয়েছে, শুধু চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ৭০০ রোগী চিকিৎসা পেয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ার কারণে চিকিৎসকরাও এখন নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু। ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক ও একজন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কাজভিনের এক সার্জনের বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ বা ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা’র অভিযোগ আনা হয়েছে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।











