ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনের হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান তাদের চলমান অনেক প্রকল্পের কাজ বন্ধ রেখেছে। এমনকি দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টেও একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে কবে নাগাদ কাজগুলো আবার স্বাভাবিকভাবে শুরু হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এতে নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নানা জটিলতার কারণেও অনেক দেশে শ্রমবাজার আগের মতো সক্রিয় হয়নি। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল। তবে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই আশায় নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এর প্রভাব পড়ায় অনেক ক্ষেত্রেই কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অনেক দেশের শ্রমবাজার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। এতে দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
দুবাইয়ের একটি বেসরকারি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রে কর্মরত বাংলাদেশি ডেন্টিস্ট নওরীন মেহজাবীন দীতি জানান, তারা দিনরাত আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। কখন মাথার ওপর মিসাইল বা ড্রোন এসে পড়ে সেই ভয়ে সময় কাটছে। তিনি বলেন, দুই দিন ধরে কাজেও যেতে পারছেন না এবং কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
সূত্র জানায়, বর্তমানে ১ কোটির বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক বিদেশে কর্মরত আছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি।
কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত অনেক ফ্লাইট স্থগিত রয়েছে। এতে ছুটিতে দেশে আসা অনেক প্রবাসী কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।
অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকলেও কোম্পানিগুলো তা নবায়ন করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। এই সংকট কতদিন স্থায়ী হবে সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।
সরকারি সূত্র জানায়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। যেসব প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে বা যাদের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে তাদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রাফিউদ্দীন আহমেদ বলেন, যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল অচল হয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না থাকলেও বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ঝুঁকিতে পড়বে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যেতে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহেও ধাক্কা লাগতে পারে।











