যেকোনো সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার যেভাবেই দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ জনগণই প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত মালিক। নির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে সংসদ, বিরোধী দল এবং গণমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি রাখে, ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে এই জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকে। সংসদ কার্যকর না থাকলে বা বিরোধী দলের ভূমিকা সীমিত থাকলে সরকারের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একটি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, যা জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবুও গত ১৮ মাসে এই সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত এবং চুক্তি নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিশেষ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ নিয়ে জনমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে সেসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা বা তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু উপদেষ্টা এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তবে এসব তদন্তের ফলাফল এবং অগ্রগতি নিয়ে জনসমক্ষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, যেগুলোর কিছু নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব চুক্তি পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এসব চুক্তি দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বা শ্বেতপত্র প্রকাশ করলে জনগণ জানতে পারবে সরকারের সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে। এটি শুধু অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নয়, ভবিষ্যতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করতেও সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর পথ উন্মুক্ত করায় ভবিষ্যতে এ ধরনের সরকার আবার দায়িত্ব নেবে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে একটি নিরপেক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে তা ভবিষ্যতের সরকারগুলোর জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে এবং জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।





