প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় বিশ্ব হিজাব দিবস। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ১৯০টি দেশে আজ “বিশ্ব হিজাব দিবস” পালিত হচ্ছে।
এটি কেবল একটি প্রতীকী দিবস নয়; বরং সেইসব নারীর আত্মঘোষণা, যারা তাদের বিশ্বাসকে লুকিয়ে রাখতে চান না, আবার জোর করেও অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চান না। হিজাব এখানে নিছক একটি কাপড় নয়; এটি পরিচয়, অধিকার ও আত্মমর্যাদার এক নীরব ঘোষণাপত্র।
বিশ্বব্যাপী যেসব মুসলিম নারী হিজাব পরিধান করেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানানো এবং ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির নারীদের হিজাবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। হিজাব মূলত এক ধরনের মাথার স্কার্ফ, যা মাথা ও গলা আবৃত রাখে। আরবি ‘হিজাব’ শব্দের অর্থ—পর্দা, আড়াল বা বিভাজন। তবে ইসলামী পরিভাষায় হিজাব কেবল বাহ্যিক পোশাক নয়; বরং এটি আচরণ, দৃষ্টি ও মননের সংযমকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে নবী! আপনি মুমিন নারীদের বলে দিন—তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে, তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” (সুরা নূর, আয়াত: ৩১)
আর অন্য আয়াতে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দিন—তারা যেন তাদের ওপর জিলবাব টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তারা কষ্টের শিকার হবে না।” (সুরা আহযাব, আয়াত: ৫৯)
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এই নির্দেশের উদ্দেশ্য হলো মুমিন নারীদের সম্মান ও পরিচয় রক্ষা করা, যেন তারা অবমাননা ও কটূক্তির শিকার না হন (তাফসির ইবন কাসীর, ৬/৪৭১)।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে পর্দা করা ফরজ। বাস্তব জীবনে অনেক মুসলিম নারী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবেও হিজাব পরেন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম নারীর কাছে হিজাব একটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইবাদতের অংশ। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন—
“পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার পর আনসারী নারীরা নিজেদের চাদর দিয়ে মাথা ও শরীর ঢেকে নিলেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৫৮)
এই হাদিস প্রমাণ করে, হিজাব কোনো পরবর্তীকালের সামাজিক সংযোজন নয়; বরং ইসলামের প্রথম প্রজন্ম থেকেই এটি নারীর ঈমানি পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্ব হিজাব দিবসের সূচনা হয় ২০১৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের বাসিন্দা নাজমা খান এই দিবসের প্রবর্তন করেন। স্কুলজীবনে হিজাব পরার কারণে তিনি যে বৈষম্য ও বিদ্বেষের শিকার হন—বিশেষত ২০০১ সালের ৯/১১–এর পর সৃষ্ট পরিস্থিতি—সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই উদ্যোগের জন্ম। তাঁর লক্ষ্য ছিল, ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির নারীরা অন্তত একদিন হিজাব পরিধান করে মুসলিম নারীদের বাস্তবতা উপলব্ধি করবেন এবং পারস্পরিক সহনশীলতা বাড়বে।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, “হিজাব দৃষ্টিকে সংযত করে, একই সঙ্গে হৃদয়কেও সংযত করে” (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ২/৫৩)। তাই বিশ্ব হিজাব দিবস কোনো একক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি মানবিক আবেদন। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—নারীর স্বাধীনতা মানে তাকে নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী বাঁচার সুযোগ দেওয়া। কেউ হিজাব বেছে নিলে সেটিও তার অধিকার, আর সেই অধিকারকে সম্মান করাই সভ্য সমাজের পরিচয়।
আজকের বিশ্বে হিজাব এক নীরব প্রতিবাদ—বিদ্বেষের বিরুদ্ধে, ভুল ধারণার বিরুদ্ধে এবং নারীর স্বাধীনতাকে একমাত্রিকভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে। বিশ্ব হিজাব দিবস সেই নীরব প্রতিবাদেরই প্রতীক।





